মানুষ চরমপন্থা ও উগ্রবাদ বেছে নেয় কখন? সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ যার জীবন চিরন্তন হতাশাগ্রস্থ নয়। তাদের উগ্র হবার প্রয়োজন হয় না।
উগ্র ব্যক্তির অবশ্যই পূর্বে বিষন্নতা পূর্ণ, উপেক্ষিত ও তিরস্কৃত হতে হয়। তার সামনে গায়ে জোরে কেড়ে নেয়া ব্যতীত বাঁচার কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না। এমনই একটি করুণবস্থার মধ্যে আছে আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় ভবিষ্যতে স্বপ্ন কিংবা চিন্তা কি? তারা কিছুই বলতে পারবে না। তার ভবিষ্যৎ এতোই অনিশ্চিত সে নিজেও জানে না, সে কি করবে জীবনে? মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ হতদরিদ্র পরিবারের কিংবা এতিম। তারা শিশু অবস্থা থেকেই সর্বাধিক জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন এবং ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে বঞ্চনার শিকার হন। এরূপ বাল্যকাল কাটিয়ে যখন যৌবনে পদার্পণ করেন এবং চাকরিবাজারে যান, সেখানেও তারা চরমভাবে উপেক্ষিত ও অপদস্থ হন। কেননা চাকরিবাজারে, যে সকল দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন তাদের সেসকল তাদের শিখানো হয়নি। এমনকি ব্যবসায়ের প্রয়োজনীয় জ্ঞান নেই। তাদের শিখানো হয়েছে তেলাওয়াতে কিভাবে মাধুর্য আনতে, ফিকহ এর প্রকারভেদ ও ইত্যাদি। যার ফলে তারা বরাবরই সর্বত্র প্রত্যাখ্যাত হন। এমন অবস্থায় তাদের সামনে যখন স্বাভাবিক বাংলা-ইংলিশ মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা আসে, যারা সবখানেই যেতে পারছে, জীবনের সবটুকু স্বাদ পেয়েছে এবং তাদেরকে যে জীবনধারা শিখানো হয়েছে তার থেকে বিপরীত ও কিছু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক অবস্থায় বসবাস করেও আনন্দে আছে। তখনই তারা চরম হীনমন্যতা থেকে উগ্রবাদী হয়ে উঠে!
এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা, যারা অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক যুবক, খুব বেশি চিন্তাশক্তির অধিকারী নয় এবং সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। তারা রাজনৈতিকভাবে, পাতি নেতা, "বড় ভাই" ও সস্তা রাজনীতিবিদদের জন্য খুব লোভনীয় রসদ। রাজনীতিবিদের পেছনে দাঁড়িয়ে যেকোনো অযাচিত ও অভদ্র বক্তব্যে না শুনে "ঠিক" চিৎকার করা, কথায় কথায় ভাঙচুর কিংবা যেকোনো অপরাধ করা, সব নোংরা করিয়ে নেয়া যায়। এবং সেই হতাশাগ্ৰস্থ ও বেকার গোষ্ঠী একটা কাজ ও সামান্য পয়সা পায়, এটাই জীবনের অর্থ হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। সকল দলের লোকেরাই তাদের ব্যবহার করে।
তবে এমনটা হওয়ার কথা নয়, ঐতিহাসিক নজির থেকে দেখা যায় ইসলামী স্বর্ণযুগে মাদ্রাসা-মক্তব ইত্যাদি জ্ঞান অন্বেষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এ সকল মাদ্রাসায় শুধু শিশুরা নয় প্রাপ্তবয়স্ক, বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ভর্তি হতো। তাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তর করার জন্য, গবেষণার জন্য ও তর্কবিতর্কের মাধ্যমে সত্যকে অনুধাবনের জন্য। যার ফলে আজ বীজগণিত, চক্ষুবিদ্যা ও ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক ধারার জন্ম হয়েছে। কালের পরিক্রমায় মাদ্রাসা সংস্কৃত হয়ে গণমানুষের মধ্যে প্রচলিত হয়, যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী।
আমি মাদ্রাসার বিরোধিতা করি না, পৃথিবীতে হয়তো দ্বিতীয় অন্য কোন এরূপ বেসরকারি পদ্ধতি নেই। যারা বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে এতো শিশুদের সাক্ষরতা ও শিক্ষা প্রদান করে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র রাষ্ট্রে যদি আগামীকাল মাদ্রাসা নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এমন একটি ভয়াবহ ব্যাধির চিত্র উঠে আসবে। যার চিকিৎসা কিংবা সমাধান কোন সরকারের কাছে নেই! কেননা, এই রাষ্ট্রের তার সকল দরিদ্র শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার অর্থনৈতিক দায়ভার নেওয়ার ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও অপারগতার জন্যই সমাজকে দায়িত্ব নিতে হয়। তাই সমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে যদি এই শিশু ও শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন মাদ্রাসাকে নতুন করে সংস্কার করা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাটা করতে হবে কার্যকরী ও বাস্তবমুখী, যাতে পরবর্তীতে তাদের জীবনে নিরাশ না হইতে হয়। যুগের সাথে যেমনে মাদ্রাসা পূর্বে যেমন সংস্করণ হয়েছে, আবারো সময়ের চাহিদা অনুযায়ী করতে হবে!
তবে, পাতি নেতা, বড় ভাই ও সস্তা রাজনীতিবিদদের কি হবে? তারা কিন্তু এতো বুঝে না যে সংস্করণের প্রসঙ্গে অভিমত দিতে পারবে। কিন্তু কতিপয় দূরদর্শী রাজনীতিবিদ আছে, যারা জানে ও বুঝে, প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার হলে ও মানুষের উন্নতি হলে সেই হতাশাগ্রস্থ জীবনের শঙ্কা কেটে যাবে, ও উগ্রবাদী তৈরির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের রাজনীতি ও সমর্থন, উভয়ই শেষ হয়ে যাবে। এই রাজনীতিবিদেরা উচ্চশিক্ষিত, চালাক ও অত্যন্ত চতুর। এরাই মাদ্রাসায় বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো পড়ানোর বিরোধিতা করে, নীতিমালা প্রণয়ন করতে দিতে চায় না এবং একটা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে দিতে চায় না। জবাবদিহি ও নজরদারির ঘাটতির ফলেই অসামাজিক ও নিকৃষ্টতম অপরাধগুলো পবিত্র স্থানে সংঘটিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ডা. শফিকুর রহমান, মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা, পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি নিজে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত। অথচ দরিদ্র মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত, যুগোপযোগী ও একান্তই প্রয়োজনীয় শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধীতা করছেন।
(বি.দ্রঃ এই লেখার উদ্দেশ্য এগুলো দাবি নয় যে মাদ্রাসার মধ্যেই উগ্রতা সীমিত কিংবা ধর্মীয় বা অতি ডানপন্থা ব্যতীত উগ্রতা নেই। বরং প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে যে পচন তৈরি হয়েছে তা তুলে ধরা এবং পচনের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মুখোস উম্মোচন করা।)